কোভিড-১৯ আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীদের চিকিৎসার অক্সিজেনের অপচয়ে বাড়ছে সংকট

0
179

কোভিড-১৯ আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীদের চিকিৎসার অন্যতম অনুষঙ্গ অক্সিজেন। মহামারির ভয়ংকর পরিস্থিতিতে উপাদানটি আমদানি করেও চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। এর মধ্যে দিনে অপচয় হচ্ছে প্রায় ২৫ টন। এছাড়া ঘাটতি আছে ১৫ টন। সব মিলে প্রয়োজনের চেয়ে ৪০ টন কম অক্সিজেন নিয়ে দিন পার করতে হচ্ছে হাসপাতালগুলোকে।

বর্তমানে দেশে মোট অক্সিজেনের চাহিদা আছে ২৪৫ টন। দেশে মেডিকেল গ্রেড অক্সিজেন প্রতিষ্ঠান দুটি, যাদের উৎপাদন ক্ষমতা ১৩৫ টন। এতে দৈনিক ঘাটতির পরিমাণ ১১০ টন। দেশের দুটি প্রতিষ্ঠান ভারত থেকে ৯৫ টন আমদানি করছে। এরপরও ঘাটতি থেকে যায় দৈনিক ১৫ টন। নানাবিধ কারণে প্রায় ১০ শতাংশ অক্সিজেন অপচয় হয়। সে হিসাবে দৈনিক প্রায় ২৫ টন অক্সিজেনে নষ্ট হচ্ছে। ফলে মুমূর্ষু রোগী সামাল দেওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এসব তথ্য দেশের অক্সিজেন গ্রহণ ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এর বাইরেও হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলায় ব্যবহৃত অক্সিজেনের অর্ধেক অপচয় হয়ে থাকে। যা অক্সিজেন উৎপাদন বণ্টন বা অপচয়ের হিসাবে যুক্ত করা হয় না। পাশাপাশি মেডিকেল গ্রেড অক্সিজেন সরবরাহকারী দুটি প্রতিষ্ঠানের বাইরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান করোনা মহামারিকালে অক্সিজেন সিলিন্ডার বিক্রি ও রিফিল করছে তারও কোনো হিসাব নেই সরকারের হাতে। এদিকে কোভিড আতঙ্কে শহরে বসবাসকারী অনেক মানুষ বাসা-বাড়িতে অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনে মজুত করে রাখছেন। একটি ছোট সিলিন্ডারে ১.৩ লিটার এবং মাঝারি সিলিন্ডারে ৬.৭ লিটার অক্সিজেন মজুত রাখা যায়। তবে সুযোগ বুঝে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী সিলিন্ডারের দাম ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা রাখছে। এসব সিলিন্ডার রিফিল করতে দেড়শ থেকে ৫শ টাকা রাখা হয়। ক্ষেত্র বিশেষ দ্বিগুণ-তিনগুণ দাম রাখা হয়। এ সুযোগে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কারখানায় ব্যবহৃত অক্সিজেন সরবরাহ করছেন। রোগীর অসহায় স্বজনরা এ ধরনের ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। তারা অধিকাংশ সময় দামাদামি না করে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনে বাড়ি যাচ্ছেন। রাজধানী ঢাকা থেকে উপজেলা পর্যায়ে প্রতিদিনই অক্সিজেনের ঘাটতি নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা জানান, কোভিড রোগী বাড়লে অক্সিজেন দ্রুত ফুরিয়ে আসে। সিলিন্ডার রিফিল করতে প্রথমে জেলায় পাঠানো হয়, সেখান থেকে ঢাকা বা চট্টগ্রামে পাঠানো হয়। এতে রিফিল করে ফিরে আসতে ৭ থেকে ১০ দিন সময় লেগে যায়।

দেশের এমন পরিস্থিতিতে ভারত থেকে সপ্তাহে দুইশ টন অক্সিজেন আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে লিন্ডে ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে লিন্ডে বাংলাদেশ দুইশ টন অক্সিজেন পেয়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে অক্সিজেনের সংকট কমে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, দেশে স্বাভাবিক সময়ে ৬০-৭০ টন অক্সিজেন প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে ২৭০ টন অক্সিজেন প্রয়োজন হচ্ছে। এ ঘাটতি মেটাতে আমদানির পাশাপাশি অক্সিজেন জেনারেটর স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগস্টের মধ্যে দেশের ৪০টি হাসপাতালে একটি করে অক্সিজেন জেনারেটর স্থাপন করা হবে। তখন আমাদের কোনো সংকট থাকবে না।

হাসপাতালগুলো অক্সিজেনের চাহিদা মেটাতে এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতে সম্প্রতি স্বাস্থ অধিদপ্তরে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় লিন্ডে বাংলাদেশের প্রতিনিধি জানান, বর্তমানে দেশে ৫৯টি হাসপাতালে তাদের ভিআইই (ভ্যাকুয়াম ইনসুলেটেড এভাপরেটর) ট্যাংক রয়েছে। চাহিদার পরিমাণ প্রতিদিন ১৫০ টন। লিন্ডের প্রতিদিনের নিজস্ব উৎপাদন ক্ষমতা ৯০ টন। আমদানি ও স্থানীয় পর্যায়ে সংগ্রহের মাধ্যমে দিনে আরও ৪৫ টনের জোগান রয়েছে। তারপরেও প্রতিদিন ১৫ টন অক্সিজেন ঘাটতি থেকে যায়। লিন্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়, এ সময়ে আমদানি বন্ধ হয়ে গেলে হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেন সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা সম্ভব হবে না।

স্পেক্ট্রা প্রতিনিধি জানান, বর্তমানে ৩৯টি হাসপাতালে তাদের ভিআইই ট্যাংক রয়েছে। চাহিদার পরিমাণ প্রতিদিন ৯৫ টন। নিজস্ব উৎপাদন ক্ষমতা প্রতিদিন ৪৫ টন। আমদানির মাধ্যম সরবরাহ প্রতিদিন ৫০ টন। তবে ভারত থেকে আমদানি বন্ধ হয়ে গেলে সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা সম্ভব হবে না।

এ দুই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিভিন্ন হাসপাতালে অক্সিজেনের পাইপলাইন পুরোনো। এতে সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় মাত্রায় অক্সিজেন সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের সমস্যা যেমন সরবরাহ লাইনে লিকেজ, ফ্লো-মিটার বন্ধ না করা ইত্যাদি কারণে ১০ শতাংশ অপচয় হয়। এছাড়া সেন্ট্রাল অক্সিজেন এবং হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা অতি ব্যবহারে আইসিইউ (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) ও এইচডিইউতে (হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিট) অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে বলেও তারা জানায়। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক পরিচালক যুগান্তরকে বলেন, হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলার মাধ্যমে অক্সিজেন সরবরাহে ক্যানোলা ব্যবহার করা হয়। এতে কোনো মাস্ক ব্যবহার করা হয় না। এতে যে ফ্লোতে অক্সিজেন নিগর্ত হয় রোগী সেই ফ্লোতে গ্রহণ করতে পারে না। এক্ষেত্রে বড় অংশ অপচয় হয়। এ অপচয়ের পরিমাণ প্রায় ৫০ শতাংশ। তবে বাইপ্যাপ বা সিপ্যাপ ব্যবহারে এ পরিমাণ অক্সিজেন অপচয় রোধ করা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অক্সিজেন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান স্পেক্ট্রা ইন্টারন্যাশনাল প্রতি লিটার অক্সিজেনের দাম নেয় ৪৪ টাকা ৫০ পয়সা। প্রতি হাসপাতালে অক্সিজেন সরবরাহ করতে তারা নেয় ১৫ হাজার ৫২৫ টাকা। এছাড়া সেন্ট্রাল অক্সিজেন ট্যাংকের ভাড়া বাবদ নেয় আরও ২৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ কোনো হাসপাতালের সেন্ট্রাল ট্যাংকের ধারণ ক্ষমতা যদি ১০ হাজার টন হয়, তাহলে সেটি একবার ভরতে ৪ লাখ ৪৫ হাজার টাকার অক্সিজেন দরকার। এরসঙ্গে যোগ হবে সরবরাহ ব্যয় ১৫ হাজার ৫২৫ টাকা এবং এক মাসের ট্যাংক ভাড়া ২৫ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে ১০ হাজার টন অক্সিজেনের দাম পড়ছে ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৫ টাকা। অর্থাৎ সব খরচসহ এক লিটার অক্সিজেনের দাম পড়ছে ৪৮ টাকা ৫৫ পয়সা। অন্যদিকে লিন্ডে বাংলাদেশ প্রতি লিটার অক্সিজেনের দাম নেয় ৪৪ টাকা ৮৫ পয়সা। প্রতি হাসপাতালে ডেলিভারি সরবরাহ চার্জ নেয় ২০১২ টাকা। হাসপাতালে স্থাপিত সেন্ট্রাল স্টোরেজ ট্যাংকের ভাড়া নেয় ১৪ হাজার ৩৭৫ টাকা এবং তরল অক্সিজেন মেনিফোল্ড কন্ট্রোল সিস্টেমের জন্য নেয় ১০ হাজার ৯২৫ টাকা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে লিন্ডে বাংলাদেশ স্থাপিত সেন্ট্রাল অক্সিজেন ট্যাংক রয়েছে ৫৯টি হাসপাতালে এবং স্পেক্ট্রা ইন্টারন্যাশাল স্থাপিত সেন্ট্রাল অক্সিজেন ট্যাংক রয়েছে ৩৯টি হাসপাতালে। এছাড়া সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে অক্সিজেন সিলিন্ডার আছে ২৪ হাজার ২০৫টি। হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা ১৬৩০টা এবং অক্সিজেন কনসেনট্রেটর ১৬৩২টি। এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশিদ আলম বলেন, এখন থেকে প্রতি সপ্তাহে দুবার ভারত থেকে ৪০০ টন অক্সিজেন আনা যাবে। এ হিসাবে মাসে ১৬০০ টন দেশে আসবে। তখন আর অক্সিজেনের সংকট থাকবে না।
বিশেষজ্ঞরা জানান, অক্সিজেন জেনারেটর হাসপাতালে স্থাপন করা হলে ট্যাংকে সংরক্ষণের জন্য কারও ওপর নির্ভর করতে হবে না বা আমদানির প্রয়োজন পড়বে না। একটি অক্সিজেন জেনারেটর মেশিনের মাধ্যমে ঘণ্টায় ৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার লিটার অক্সিজেন উৎপাদন করা সম্ভব। তবে সমস্যা হলো, এটি পরিচালনার মতো জনবল হাসপাতালগুলোতে নেই। এক্ষেত্রে দক্ষ জনবল নিয়োগ ছাড়া এসব মেশিন স্থাপন করেও কোনো ফল পাওয়া যাবে না।

আপনার মন্তব্য জানান