গল্পঃ নিঃশব্দ সমাপ্তি!!

0
291

নিঃশব্দ সমাপ্তি
লেখকঃ এস এম সায়েম

অনেক খুঁজেছে শুধু খুঁজেই যাচ্ছে। ভার্সিটির প্রতিটি অলিগলিতে, মাঠের কোণায় আড্ডার জায়গায়।চায়ের দোকানের ভাঙ্গা টুলে, পুকুর পাড়ের কাট গোলাপ গাছের ছায়ায়।কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবীটা শুন্যতায় ছেঁয়ে গেল। এক পর্যায়ে অদ্রিতা তার ব্যর্থ পরিশ্রমের ইতি টেনে শিমুলতলার বেঞ্চটিতে বসে কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে বলল-অণি তুই কোথায়????

এতক্ষণ যার কথা বলছিলাম তার নাম অণিরুদ্ধ।অণিরুদ্ধ,অদ্রিতা,সিমু,মৌ,হাসিব,সৌমিক আর নিলয় এরা ছিলো ভার্সিটির একটা গ্রুপ।তাদের বন্ধুত্ব ও বন্ধন সবার ঈর্ষনীয় ছিল।অণি আর অদ্রিতা বলতে গেলে বন্ধুর চেয়েও বেশিকিছু।

ভার্সিটির প্রতিটি অলিগলিতে তাদের দুষ্টুমির চিহ্ন স্পষ্টত।অণি ছিলো সবার জন্য একটা অনন্যময় বন্ধু। কারো দুঃখ,মন খারাপ বলতে গেলে সব কিছুই ভুলে যেত অণির সঙ্গ পেলে। আজ অদ্রিতা এত খোঁজার কারণটা খুবই আশ্চর্যজনক।একটা মূহুর্তও মন খারাপে সময় কাটত না তার শুধুমাত্র অণির জন্য।তাদেরকে অনেকে মডেল কাপলও বলতো। প্রত্যেকটা সময় তাদের মাঝের খুনসুটিগুলো সবাইকে দারুনভাবে আকর্ষিত করতো।
অদ্রিতা চোখ মুছতে মুছতে গেল মাঠের কোণায় যেখানে বসে কত মারামারি করতো তারা। একবার সবগুলা এসাইনমেন্ট অদ্রিতা হাতে করিয়ে তাকে চকলেট খাওয়ানোর কথা বলে আর খাওয়ায়নি দেখে পুরো মাঠে একজন একজনকে দৌঁড়ালো, একপর্যায়ে অদ্রিতা মেয়েদের প্রধান অস্ত্র চোখের পানি ছাড়তে শুরু করলো।তখন অণি কাছে আসতেই ইচ্ছেমত মারলো আবার সেই অণির কাঁধেই মাথা রেখে সব ভুলে হাসতে শুরু করলো।

অদ্রিতা মাঠের কোণা ছেড়ে ক্যান্টিনে গিয়ে এক কাপ কপি হাতে বসলো ।তারা রোজ গানের আসর বসাতো অণির গিটারের আওয়াজ আর অদ্রিতার সুমধুর কন্ঠের কোনো জুড়ি ছিলোনা।দুজনেই যেন একটা বিশাল মঞ্চ কাঁপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।ক্যান্টিনের কতদিনের বিল যে অদ্রিতার হাতে ধরিয়ে দিতো তার কোনো ঠিক নেই।একজন একজনের খাবার কেড়ে খাওয়ার দৃশ্যটা যেন চোখে ভাসে।
নাহ অদ্রিতা আর ধরে রাখতে পারেনি নিজেকে সে সোজা ক্যাম্পাসে তাদের ক্লাসে চলে যায়।সেখানেও রোজ দুজনে একসাথে বসতো।আজও মনে পড়ে অণি ক্লাসে বসেই অদ্রিতার পুরো একটা স্কেচ করে ফেলেছিলো।কি নিখুঁত ছিলো।অদ্রিতা তো সেই স্কেচটা রোজ দেখে আর নতুন করে অণির মায়ায় জড়িয়ে যায়।
রিক্সা করে শহরটা কত ঘুরাঘুরি হতো তাদের তার ঠিক নেই।হুটহাট করে অণি হারিয়ে যেত আর তাকে না পেয়ে অদ্রিতার কতবার যে পথের ধারে একা একা কাঁদতে হয়েছে।দেখা যেত মিনিট দশেক পর আবার হয়তো ফুল নয়ত অবাক করা কিছু নিয়ে এসে পিছন থেকে হাতটা ধরে হাঁটতে থাকতো।অদ্রিতা ভাবতে তারা যেন কতযুগ এভাবে হেঁটে আসছে।খুশিতে আর অভিমানে এক মিশ্রিত মুখ তৈরী হতো তার। সে ভাবতো এ হাত যেন কখনো না আলাদা হয়।এ যেন এক বিশ্বাস আর ভরসার ভিত্তি।

ওইযে কাটগোলাপ গাছের কথা বলেছিলাম।অদ্রিতা সেখানেই বসে আছে এখন।তার এখনো স্পষ্ট মনে পড়ে ভার্সিটির শুরুতে এই কাটগোলাপ গাছের নিচেই অণির সাথে তার পরিচয় তাও আবার ঝগড়া দিয়ে।নিচ থেকে ধরা যায় এমন একটা কাটগোলাপ নেওয়ার জন্য অদ্রিতা লাপাচ্ছিলো আর ওদিকে অণি পিছন থেকে বলে উঠলো এরকম করে এজীবনে আপনার ফুল পাওয়া হবেনা।অদ্রিতা সবসময়ই কথা ভিন্নভাবে নিত।সোজাকথা সহজ কথাকে কঠিন করে নিত।সে অণির সামনে এসে বলল- কি বলতে চাচ্ছেন হুমমমম।আমি বাটুল!!অণিও মজা শুরু করলো-আমার তো তাই মনে হয়।এভাবেই ঝগড়া শুরু আর অণি নিজেই ফুলটা নিয়ে চুপচাপ অদ্রিতার মাথায় পরিয়ে দিয়ে চলে গেল।সেদিনের মত আজও অদ্রিতা নিশ্চুপ হয়ে পথের দিকে তাকিয়ে আছে।

এত আনন্দ এত সুখের মাঝে কাল হয়ে দাঁড়ালো এক পথশিশু।একদিন অদ্রিতা দেখলো অণি একটা ছোট ছেলের হাত ধরে পথের ধারে হাঁটছে।এভাবে কয়েকদিনই দেখলো তাই কৌতুহলটা মিটানোর জন্য অদ্রিতা একা ছেলেটির সাথে দেখা করে আর এমনভাবে কথা বলল যেন সে অণি আর ছেলেটির সম্পর্কের সব জানে।ছেলেটি কথার মাঝেই বলল-আইচ্ছা আপা ভালা মানুষগুলা দুনিয়াতে বেশিদিন বাঁচেনা কেন?অদ্রিতা কিছুটা চমকে গিয়ে জিগ্যেস করলো -কে সেই ভালো মানুষ?কেন আপা আপনে জানেননা অণি ভাই বেশিদিন বাঁচবো না।কথাটা যেন গলায় কাঁটার মত বিধলো অদ্রিতা চুপচাপ উঠে চলে আসলো আর অণিকে কল দিলে জরুরী দেখা করতে বলল।

দুজনেই চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওই কাটগোলাপ গাছের নিচে।অণিরুদ্ধের ব্রেইন টিউমার ডাক্তার বলেছে লাস্ট স্টেজে আছে যেকোনো সময় কিছু ঘটতে পারে।।অণি নিজেকে আটকে রাখতে পরেনি অদ্রিতাকে জড়িয়ে কাঁদতে লাগলো অভিমানি অদ্রিতার রাগ ভাঙ্গানোর জন্য।অদ্রিতাও কাঁদছে আর বারবার দুঃখ আর অভিমান নিয়ে বলছে তুই আমাদের আগে বলিসনি কেন???????

এভাবেই আমাদের পাশের অনেক প্রিয়জন নিজেদেরকে লুকিয়ে রাখে হয়তো যদি আমাকে বাকী সময় কারো সহানুভূতি নিয়ে বাঁচতে হয়।আর সবচেয়ে কাছের মানুষটাকে জানানো হয়না তার কষ্ট হবে বলে।এমন অনেক কাহিনী এখনো বাস্তবতায় চলমান।।গল্পটা লিখলাম আমার এক পরিচিত জনের স্মৃতি হিসেবে।আমার সাথে তার পরিচয় ছিলো ৩ ঘন্টা ২০ মিনিটের।।।তার কাহিনীটাই তুলে ধরলাম।

আপনার মন্তব্য জানান